মাত্র ২০০ টাকা দিয়ে শুরু করেছিলেন চটপটি ব্যবসা। সেই টাকায় চলত সংসার। এই
করে এসএসসি পাস করলেন। কিন্তু আটকে গেলেন এইচএসসিতে। টাকার অভাবে ফরম পূরণ
করা হয় না তাঁর। সেই সঙ্গে পড়াশোনায় ইতি টানতে হয়। এবার চটপটি ব্যবসায় মন
দেন। ধীরে ধীরে ব্যবসায় প্রসার ঘটতে থাকে। মাঝে পশুপাখি পালনের ওপর
প্রশিক্ষণ নেন। শুরু হয় কোয়েল পাখি পালন।
মতিয়ারের দিনবদলের গল্পের শুরু সেখান থেকেই। যশোরের অভয়নগর উপজেলার প্রেমবাগ গ্রামের মতিয়ার রহমান (২৫) এখন একজন সফল ব্যবসায়ী ও কোয়েল পাখির খামারি। তাঁকে অনুসরণ করে এলাকার অনেকে কোয়েলের খামার করেছেন।
২০০০ সালের কথা। মতিয়ার তখন অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র। টানাটানির সংসার। একটি বেসরকারি সংস্থা থেকে তিন হাজার টাকা ঋণ নিয়ে ভ্যান কিনলেন। শুরু করলেন ভ্যান চালানো। সেই উপার্জন দিয়ে চলতে লাগল সংসার। পাশাপাশি লেখাপড়া। সমস্যা দেখা দিল বছর দুই পরে। সড়ক দুর্ঘটনায় কোমরের হাড় ভেঙে গেল তাঁর, সঙ্গে ভ্যানটিও গেল। চিকিৎসা শেষে সুস্থ হলেন। ২০০ টাকা ধার নিয়ে কিনলেন একটি চটপটির গাড়ি। শুরু করলেন চটপটি বিক্রি। ২০০৩ সালে এসএসসি পাস করলেন। ভর্তি হলেন সিঙ্গিয়া আদর্শ ডিগ্রি কলেজে। কিন্তু টাকার অভাবে এইচএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণ করতে পারলেন না। অগত্যা চটপটির ব্যবসাটা বাড়ালেন আরও।
২০০৭ সালে পশুপাখি পালনের ওপর তিন মাসের প্রশিক্ষণ নিলেন। ভালো লাগল। এরপর উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পশুসম্পদ ও মুরগি পালনের ওপর ছয় মাসের প্রশিক্ষণ নেন মতিয়ার। পরের বছর শুরু করলেন কোয়েল পাখির খামার। সাড়ে ছয় টাকা দরে কেনা ১৫০টি কোয়েলের বাচ্চা দিয়ে তাঁর খামারের যাত্রা শুরু।
মতিয়ারের চটপটি: পার্শ্ববর্তী রূপদিয়া বাজারে একটি ঘর ভাড়া নিয়ে চটপটি বিক্রি করছেন মতিয়ার। দোকানের নাম ‘মতিয়ারের চটপটি’। তাঁর বানানো চটপটির সুনাম আছে বেশ। মতিয়ার নিজে, বাবা আবদুল করিম মোল্লা ছাড়াও দুজন কর্মচারী আছেন দোকানে। সব খরচ বাদে চটপটি বিক্রি করে মাসে ১০-১২ হাজার টাকা আয় থাকে তাঁর।
মতিয়ারের কোয়েল খামার: খামারে সব মিলিয়ে কোয়েল আছে তিন হাজার। এর মধ্যে প্যারেন্টস কোয়েল আছে আড়াই হাজার। এগুলো প্রতিদিন গড়ে এক হাজার ৮০০ ডিম দেয়। কয়েক মাস আগে মতিয়ার ৫০ হাজার টাকায় একটি ডিম ফোটানোর যন্ত্র (ইনকিউবেটর) কিনেছেন। প্রতি মাসে ১৫ হাজার বাচ্চা ফোটান তিনি।
একদিনের বাচ্চা ছয় টাকা দরে এবং প্রতিটি ডিম এক টাকা ৩০ পয়সা দরে বিক্রি করেন। ১৫০ গ্রাম ওজনের একটি কোয়েল পাখি ১৯ টাকায় বিক্রি হয়। একজন কর্মচারী তাঁর কোয়েল পাখির খামার দেখাশোনা করেন। কর্মচারীর বেতন, কোয়েলের খাবার, ওষুধ, বিদ্যুৎ বিল—সব মিলিয়ে মাসে ৪০ হাজার টাকা খরচ হয়। এর পরও মাসে ৩৫-৪০ হাজার টাকা লাভ থাকে তাঁর।
মতিয়ারের কোয়েলের খামার দেখে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন এলাকার অনেক বেকার যুবক। তাঁকে দেখে অন্তত ১৫ জন বেকার যুবক কোয়েল পালন শুরু করেছেন। তাঁদের মধ্যে আছেন প্রেমবাগ গ্রামের আমিনুর রহমান, আশরাফুল ইসলাম ও রফিকুল ইসলাম, বনগ্রাম গ্রামের মাহাবুর রহমান, চেঙ্গুটিয়া গ্রামের বায়েজিদ হোসেন, নওয়াপাড়া গ্রামের ইউনুস আলী প্রমুখ।
মতিয়ারের স্বপ্ন: ‘গোয়ালভরা গরু, আর পুকুরভরা মাছ—এই আমার স্বপ্ন। আমার চটপটির সুনাম আছে। মানুষ আগ্রহ করে খেতে আসে। কোয়েল পাখি পালনও অত্যন্ত লাভজনক। সেটাও করছি। আমি আমার লক্ষ্যে পৌঁছাতে চাই যেকোনো মূল্যে।’ দৃঢ়তার সঙ্গে কথাগুলো বললেন মতিয়ার।
প্রেমবাগ ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান রণপতি মণ্ডল বলেন, ‘মতিয়ার খুব ভালো কাজ করছেন। এলাকার বেকার যুবকদের কাছে তিনি এখন এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।’
অভয়নগর উপজেলা পশুসম্পদ কর্মকর্তা পল্লব কুমার দত্ত বলেন, ‘কোয়েল পালন অত্যন্ত লাভজনক। মতিয়ার রহমান প্রসংশনীয় উদ্যোগ নিয়েছেন। তাঁর দেখাদেখি অনেকেই এগিয়ে আসছেন। এটা খুবই ইতিবাচক।’
No comments:
Post a Comment