শিক্ষিত বেকার যুবক মেহেদী হাসানের ছোট বেলা থেকেই ছিল উচ্চ ও বিলাসী
স্বপ্ন । স্বপ্নের ধারাবাহিকতায় তার বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বপ্নরা বড়
হতে থাকে । এইচএসসি পাস করার পর স্বপ্ন তাকে তাড়িত করে স্বপ্নের দেশ
আমরিকা পাড়ি দেয়ার । প্রবাসী বাবার সঞ্চিত অর্থ জমা দেয় সে বিদেশে যেতে ।
কিন্ত দালালের খপ্পরে পড়ে ভেঙ্গে যায় স্বপ্ন । জীবনে এসে সঙ্গী হয়
হতাশা আর বিষাদ । এখন মেহেদী কম্পিউটার সায়েন্সে পড়ালেখা করছেন একটি
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে । প্রতি মাসে সংসারে তিনি তুলে দিচ্ছেন ৫০ থেকে
৬০ হাজার টাকা । ২০১৪ সালে তিনি শুরু করেন কয়েল পালন । এ কয়েল পাখি দিয়ে
শুরু হয় নতুন করে স্বপ্ন বোনা । ২০১৩ সালে টাকা টাকা নিয়ে উধাও হয়ে যায়
দালাল । পারিবারিক ভৎসনায় জীবন যখন দুর্বিষহ, তখন কেবল সময় কাটাতে স্থানীয়
মুরা পাড়াপাড়া বাজার থেকে ১০ টি কয়েল পাখি কিনে আনেন মেহেদি হাসান । এক
সময় পাখিগুলো নিয়মিত ডিম দেয়া শুরু করলে আগ্রহ বাড়ে তার । বঙ্গবন্ধু
আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের সামনে অনুষ্ঠিত পাখি মেলায় গিয়ে জানতে
পারেন, দেশের নামি-দামি কয়েকটি হ্যাচারির গল্প । এর পর ফরিদপুরের ইকো
হ্যাচারিতে কয়েক মাস কাজ করে মেহেদী হয়ে ওঠেন কোয়েল পাখি পালনে পারদর্শী ।
পরে গাজীপুরের কালীগঞ্জ এলাকার এক খামারির কাছ থেকে ৯ হাজার টাকায় ৬০০
কোয়েল পাখি কিনে অ্যানে বাড়িতে গড়ে তোলেন ছোট একটি খামার । ৬ মাসেই তার
ভালো হয় । এর পর খামারের আকার আরও বড় করার স্বপ্ন দেখেন তিনি । কিনে আনেন
আরও ১ হাজার পাখি । আর পেছনে তাকাতে হয়নি তার। টানাটানির সংসারে হাল
ধরতেই বছরের শেষ মাথায় এসে গড়ে তোলেন দুইটি বড় খামার । এখন প্রতিদিন
তার খামারে ৬ হাজার ডিম সংগ্রহ হচ্ছে। খামারে রয়েছে ৮ হাজারেরও বেশি কোয়েল
পাখি । পাখির ডিমগুলো এক সময় বাইরের বাজারে বিক্রি করলেও পরে গেল বছর
নভেম্বরে নিজেই মাসিক ২০ হাজার টাকায় একটি বাড়ি নিয়ে গড়ে তোলেন হ্যাচারি ।
বাচ্চা ফোটানোর জন্য ২৭ লাখ টাকায় কিনেছেন কেনিয়ার তৈরি দুইটি ইনকিউবেটর
মেশিন। প্রতিদিন ৮ হাজার বাচ্চা ফোটানো হচ্ছে। পরিবেশ রক্ষায় নিজ বাড়িতে
বাড়িতে বায়োগ্যাস প্লান্ট তৈরি করাও পরিকল্পনা রয়েছে তার। শুধু কোয়েলের
বিষ্ঠা দিয়ে তৈরি বায়োগ্যাস দিয়ে মেটানো হবে সংসারের চাহিদা। এজন্য সব
প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন। আমেরিকা গিয়ে যে পরিমাণ অর্থ উপার্জনের স্বপ্ন
দেখতেন মেহেদি, আজ ঘড়ে বসেই তার চেয়ে বেশি টাকা উপার্জন করতে পারছেন তিনি।
তার কাছ থেকে উৎসাহ পেয়ে একই এলাকার অপু, মহিবুর, রশিদ, হৃদয়, নুর আলম,
সানু মোল্লা, রিফাত, কবির হোসেন, আইয়ুব খান, আসলাম, সুমন সহ তার খামার থেকে
কোয়েল পাখি সংগ্রহ করে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সোনারগাঁয়, আড়াইহাজার
উপজেলা ছাড়াও গাজীপুর, নরসিংদী, ময়মনসিংহের ভালুকা, দাউদকান্দি,
মুন্সিগঞ্জের বিভিন্ন অঞ্চলে বহু কোয়েল পাখি পালনের খামার গড়ে তোলা হয়েছে।
এসব খামারের আয় দিয়ে কয়েকশ পড়িবারের ভরণপোষণ হচ্ছে। মেহেদি হাসান বলেন,
বেকার যুবকরা চাকুরির পেছনে না ঘুরে অল্পকিছু টাকা দিয়ে কোয়েল পাখির খামার
করে স্বাবলম্বী হতে পারে। ১ থেকে দেড় লাখ টাকা ব্যয় করে মাসে ২০ থেকে ২৫
হাজার টাকা আয় করতে পারে। তিনি আরো জানান, একটি বাচ্চা পাখি বিক্রি হয় ১০
থেকে ১৫ টাকায়। ডিম ফোটাতে খরচ হয় ১ টাকা করে। প্রতিদিন প্রতিটি কোয়েল পাখি
ডিম দেয় একটি করে। প্রতিটি ডিম বিক্রি হয় ২ টাকায়। একটি পাখি ১৮ মাস ডিম
দেয়। তারপর সেই পাখি মাংস হিসেবে ৩০ থেকে ৩৫ টাকায় বিক্রি করা হয়। কোয়েলের
ডিমে অনেক প্রোটিন রয়েছে। এতে কোলেস্টেরলের মত্রা খুবেই কম, যা ছোট
ছেলে-মেয়ে বা ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য খুবেই উপকারী। আকারে ছোট অথচ গুনে ও
মানে অনেক বড় পাখি কোয়েল। এ পাখি অর্থের পাশাপাশি আমাকে আনে দিচ্ছে খ্যাতি।
No comments:
Post a Comment