Wednesday, August 17, 2016

নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে বাণিজ্যিক ভিত্তিতিতে কোয়েল পাখি পালন



নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে কোয়েল পাখি বাণিজ্যিক ভিত্তিতিতে পালন করে অনেকেই জীবন-জীবিকা নির্বাহের পথ খুঁজে পেয়েছেনপড়াশুনা শেষ করে চাকুরীর পেছনে না ঘুরে বাড়িতে বসে পাখি সচ্ছল হচ্ছেনস্থানীয় পর্যায়ে পাখি ও ডিমের ব্যাপক চাহিদা থাকায় এলাকায় নতুন নতুন খামার গড়ে তুলছেন অনেকেইছোট-বড় খামার করে প্রতিনিয়ত অনেকেই হয়ে উঠেছেন আত্মনির্ভরশীলপড়াশুনার পাশাপাশি অনেক শিক্ষার্থীও অবসর সময়ে পাখি পালন করে পড়াশুনার খরচ জোগাচ্ছেনপরিবারে আর্থিক সাহার্য করছেনপাইকার ও ফড়িয়ারা বাড়ি বাড়ি ঘুরে বিভিন্ন পাখি ও ডিম খামার থেকে কিনে নিয়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে বিক্রি করছেন

উপজেলা প্রাণি সম্পদ অধিদফরের তথ্য মতে, আড়াইহাজার উপজেলার বিভিন্ন এলাকার বাণিজ্যিক ভিত্তিতে কোয়েল পালন করছেন শতাধিক ছোট-বড় খামারীএদের মধ্যে সফল খামারী মনির হোসেনছোট বেলা থেকেই তার স্বপন ছিল লেখাপড়া করে বড় হওয়ারকিন্তু সংসারের পিছু টান তার সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নিস্থানীয় এইচএসসি পাস করার পর তার লেখা পড়া বন্ধ হয়ে যায়সংসারে অভাব-অনটন তার এগিয়ে যাওয়াকে পথকে থামাতে পারলেও, বসে থাকেননি তিনিস্থনীয় এক খামারীর পরামর্শ নিয়ে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে কোয়েল পালন করে দূর করেছেন সংসারের অভাব

খামারী মনির বলেন, সংসারের অভাব-অনটের কারণে তিনি বেশী দূর পড়ালেখা করতে পারেনিস্থানীয় কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করে বিভিন্ন স্থানে চাকরীর জন্য দুই বছর ঘুরে বেড়িয়েছেনকিন্তু চাকরীর নামের সোনার হরিণটি তিনি ধরতে পারেনি পরে স্থানীয় কালিবাড়ি বাজারে তিনি ক্ষুদ্র একটি ব্যবসা শুরু করেনসেখানে লোকসান হলে তিনি ব্যবসাটি বন্ধ করে দেন২০১৩ সালের এলাকার খামারী মিজানের পরামর্শ নিয়ে নরসিংদী চর নগরদী এলাকায় একটি হ্যাচারী থেকে একমাস বয়সের ২৫০০ পিস কোয়েল পাখি প্রতিটি ৪৫ টাকা করে কিনে এনে বাড়ির ছাদের ওপর খামার স্থাপন করেন৭০ দিন পালনের পর পাখিগুলো ডিম দেয়া শুরু করেপ্রতি মাসে ৮ হাজার থেকে ৯ হাজার ডিম পাচ্ছেন তিনিএকটি ডিমের বাজার মূল্য ২টাকা সপ্তাহে দুইদিন ঢাকার খিলগাঁও ও নীমতলী থেকে পাইকাররা ডিম কিনে নিয়ে যায় তিনি আরো জানান, একটি পূর্ণ বয়স্ক পাখি এক বছর ডিম দেয়খাবার হিসাবে পোল্টি ফিড খাওয়ানো হচ্ছেখামারে প্রতিদিন রাত ১১ থেকে ভোর ৭টা পর্যন্ত আলো বন্ধ করে দেয়া হয়এতে খাবার সাশ্রয় হয়দুপুর ১১টা থেকে সন্ধা ৭টা পর্যন্ত কোয়েল ডিম দিয়ে থাকেনতিনি নিজেই তার খামারটি দেখাশুনা করেনতিনি বলেন, কম সুদে আর্থিক সুবিধা পেলে খামারের পরিধি আরও বাড়ানো যেত বলে জানান তিনিদেশী জাতের কোয়েল পাখি বেশী ডিম দিয়ে থাকেপ্রতি মাসেই তার ২০ হাজার টাকা আয় হচ্ছেসংসারের খরচ বাদে তিনি প্রতি মাসে কিছু টাকা সঞ্চয় করছেনএর আয় দিয়ে এক ছেলেকে স্কুলে পড়াচ্ছেনএক মেয়ে কে এরই মধ্যে বিয়ে দিয়েছেনকোয়েল পাখির মাংসের প্রচুর পুষ্টি গুন রয়েছেএর ডিম খেতেও অনেক সুস্বাদুঅসুখ-বিসুখ হলে তিনি নিজেই চিকিৎসা দিয়ে থাকেনতার দেখাদেখি এলাকায় অনেকেই কোয়েল পাখির খামার গড়ে তুলেছেন

টেসের কান্দির মিয়া চাঁন জানান, তিনি ২০১৪ সাল থেকে কোয়েল পাখি পালন করে আসছেনতিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে অল্প বেতনে চাকরী করতেনখামারী মনিরের কাছ থেকে পরামর্শ পেয়ে তিনি প্রথমে ৬৫০০ পিস কোয়েল পাখি কিনে তার খামারটি নিজের বাড়িতে গড়ে তুলেছেনপ্রতিদিন ৪ হাজার থেকে ৪৫০০ পিস ডিম পাওয়া যাচ্ছেকোয়েল পাখির রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা প্রচুর; তাই যে কেউ অল্প পুঁজিতে এ পাখি পালন করতে পারেনতার খামারটি সার্বক্ষনিক দেখাশুনা করার জন্য একজন যুবককে মাসে ৮ হাজার বেতন দেয়া হচ্ছে

বিদেশ ফেরত চল্লিশ বছর বয়সী কালাম জানান, তিনি ২০১১ সালে মালয়েশিয়ায় গিয়ে ছিলেনসেখানে গিয়ে তিনি প্রতারণার শিকার হয়েছেনদালাল যে কাজের কথা বলে নিয়েছেনতাকে সেই কাজ দেয়া হয়নিঅনেক কষ্ট করে বছর খানেক বিদেশে অবস্থান করেনপরে বাড়িতে ফিরে আসেনচোখে মুখে অন্ধকার দেখ ছিলেন তিনিএক পর্যায়ে প্রতিবেশী খামারী বিল্লালের পরামর্শ নিয়ে তিনি ৭ হাজার পিস কোলে পাখি ক্রয় করে তার নিজের বাড়িতে একটি পরিত্যক্ত ঘরে খামার গড়ে তুলেছেনখামারে বর্তমানে ৩ জন শ্রমিক ৬ হাজার টাকা বেতনে স্থায়ী ভাবে কাজ করেছেনতিনি কোয়েল পাখির খামারের পাশাপাশি মৎস্য খামার গড়ে তুলেছেনবেকার যুবকদের প্রতি তার পরামর্শ বিদেশ পারি না দিয় নিজের বাড়িতেই একটি কোয়েল পাখির খামার করলে বিদেশের টাকা বাড়িতে বসেই আয় করা সম্ভব

আরেক খামারি মিজান জানান, আড়াইহাজারে বিভিন্ন জাতের কোয়েল পাখি পালন করে শত শত বেকার যুবক তাদের ভাগ্য বদল করেছেনছোট কোয়েলে পরিণত হয়েছে বড় ধরনের অর্থ উপার্জনের উৎসেএলাকায় বাড়ছে কোয়েল পাখির ব্যবসায়ী ও ক্রেতার সংখ্যাতিনি আরও বলেন, কোয়েল পালনের জন্য বেশী পুঁজির দরকার হয় না বাচ্চা, ডিম বিক্রিতেও কোনো অসুবিধা হয় নাস্থানীয় পাইকার ও ফড়িয়া বাড়ি বাড়ি ঘুরে পাখি ও ডিম সংগ্রহ করে থাকেনঅল্প সময়ের মধ্যেই স্বপ্ন পূরণ হওয়া সম্ভবপ্রতি মাসেই তার ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা আয় হচ্ছেতার খামারটি নিজেই দেখাশুনা করছেন 

আড়াইহাজার উপজেলা প্রাণি সম্পদ অধিদফতরের কর্মকর্তা ডাক্তার মো: ফারুক আহাম্মদ জানান, আমার জানা মতে আড়াইহাজার উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ছোট-বড় প্রায় শতাধিক কোয়েল পাখির খামার রয়েছেরোগবালাই কম হওয়ায় অনেকেই কোয়েল বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পালন করে লাভবান হচ্ছেনতিনি বলেন, কোয়েল পাখিকে বছরে একবার কৃমিনাশক খাওয়াতে হয়প্রিজন মেলেরিয়া, প্রিজন ফক্স (বসন্ত) রোগের জন্য তেমন কোনো ঔষধ নেইতবে নারী ক্ষেত রোগের জন্য টিকা রয়েছে

No comments:

Post a Comment