নারায়ণগঞ্জের
আড়াইহাজারে কোয়েল পাখি বাণিজ্যিক ভিত্তিতিতে পালন করে অনেকেই জীবন-জীবিকা নির্বাহের পথ খুঁজে পেয়েছেন। পড়াশুনা শেষ করে চাকুরীর পেছনে না
ঘুরে বাড়িতে বসে পাখি সচ্ছল হচ্ছেন। স্থানীয়
পর্যায়ে পাখি ও ডিমের ব্যাপক
চাহিদা থাকায় এলাকায় নতুন নতুন খামার গড়ে তুলছেন অনেকেই। ছোট-বড় খামার করে
প্রতিনিয়ত অনেকেই হয়ে উঠেছেন আত্মনির্ভরশীল। পড়াশুনার
পাশাপাশি অনেক শিক্ষার্থীও অবসর সময়ে পাখি
পালন করে পড়াশুনার খরচ জোগাচ্ছেন। পরিবারে আর্থিক সাহার্য করছেন। পাইকার
ও ফড়িয়ারা বাড়ি বাড়ি ঘুরে বিভিন্ন পাখি ও ডিম
খামার থেকে কিনে নিয়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে বিক্রি করছেন।
উপজেলা
প্রাণি সম্পদ অধিদফরের তথ্য মতে, আড়াইহাজার উপজেলার বিভিন্ন
এলাকার বাণিজ্যিক ভিত্তিতে কোয়েল পালন করছেন
শতাধিক ছোট-বড় খামারী। এদের মধ্যে সফল খামারী মনির হোসেন। ছোট
বেলা থেকেই তার স্বপন ছিল লেখাপড়া করে বড় হওয়ার। কিন্তু সংসারের পিছু টান তার সেই স্বপ্ন
পূরণ হয়নি। স্থানীয়
এইচএসসি পাস করার পর তার লেখা পড়া বন্ধ
হয়ে যায়। সংসারে অভাব-অনটন
তার এগিয়ে যাওয়াকে পথকে থামাতে পারলেও,
বসে
থাকেননি তিনি। স্থনীয় এক
খামারীর পরামর্শ নিয়ে
বাণিজ্যিক ভিত্তিতে কোয়েল পালন করে দূর করেছেন সংসারের অভাব।
খামারী মনির
বলেন, সংসারের অভাব-অনটের কারণে তিনি বেশী দূর পড়ালেখা করতে পারেনি। স্থানীয়
কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করে বিভিন্ন স্থানে চাকরীর জন্য দুই বছর ঘুরে বেড়িয়েছেন। কিন্তু
চাকরীর নামের সোনার হরিণটি তিনি ধরতে পারেনি। পরে স্থানীয় কালিবাড়ি বাজারে তিনি
ক্ষুদ্র একটি ব্যবসা শুরু করেন। সেখানে লোকসান হলে তিনি ব্যবসাটি বন্ধ করে দেন। ২০১৩ সালের এলাকার খামারী মিজানের পরামর্শ
নিয়ে নরসিংদী চর নগরদী এলাকায় একটি হ্যাচারী থেকে একমাস বয়সের ২৫০০ পিস কোয়েল পাখি প্রতিটি ৪৫ টাকা করে কিনে এনে বাড়ির ছাদের ওপর
খামার স্থাপন করেন। ৭০ দিন পালনের পর পাখিগুলো ডিম দেয়া শুরু করে। প্রতি মাসে ৮ হাজার
থেকে ৯ হাজার ডিম পাচ্ছেন তিনি। একটি
ডিমের বাজার মূল্য ২টাকা। সপ্তাহে দুইদিন ঢাকার খিলগাঁও ও নীমতলী থেকে পাইকাররা ডিম কিনে
নিয়ে যায়। তিনি
আরো জানান, একটি পূর্ণ বয়স্ক পাখি এক বছর ডিম দেয়। খাবার হিসাবে পোল্টি
ফিড খাওয়ানো হচ্ছে। খামারে
প্রতিদিন রাত ১১ থেকে ভোর ৭টা পর্যন্ত আলো
বন্ধ করে দেয়া হয়। এতে খাবার
সাশ্রয় হয়। দুপুর ১১টা
থেকে সন্ধা ৭টা পর্যন্ত
কোয়েল ডিম দিয়ে থাকেন। তিনি নিজেই
তার খামারটি দেখাশুনা করেন। তিনি বলেন, কম সুদে আর্থিক সুবিধা পেলে খামারের
পরিধি আরও বাড়ানো যেত বলে জানান তিনি। দেশী জাতের কোয়েল পাখি বেশী ডিম দিয়ে
থাকে। প্রতি মাসেই তার ২০ হাজার টাকা আয় হচ্ছে। সংসারের
খরচ বাদে তিনি প্রতি মাসে কিছু টাকা সঞ্চয় করছেন। এর আয় দিয়ে এক ছেলেকে স্কুলে পড়াচ্ছেন। এক মেয়ে কে এরই মধ্যে বিয়ে দিয়েছেন। কোয়েল
পাখির মাংসের প্রচুর পুষ্টি গুন রয়েছে। এর
ডিম খেতেও অনেক সুস্বাদু। অসুখ-বিসুখ হলে তিনি নিজেই চিকিৎসা দিয়ে
থাকেন। তার দেখাদেখি এলাকায়
অনেকেই কোয়েল পাখির খামার গড়ে তুলেছেন।
টেসের
কান্দির মিয়া চাঁন জানান, তিনি ২০১৪ সাল থেকে কোয়েল পাখি পালন করে আসছেন। তিনি
একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে অল্প বেতনে চাকরী করতেন। খামারী মনিরের কাছ
থেকে পরামর্শ পেয়ে তিনি প্রথমে ৬৫০০ পিস কোয়েল পাখি কিনে তার খামারটি নিজের বাড়িতে গড়ে তুলেছেন। প্রতিদিন ৪ হাজার থেকে ৪৫০০ পিস ডিম পাওয়া
যাচ্ছে। কোয়েল পাখির
রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা প্রচুর; তাই যে কেউ অল্প পুঁজিতে এ পাখি পালন করতে পারেন। তার খামারটি সার্বক্ষনিক দেখাশুনা করার জন্য একজন যুবককে মাসে ৮ হাজার বেতন দেয়া হচ্ছে।
বিদেশ ফেরত
চল্লিশ বছর বয়সী কালাম জানান, তিনি ২০১১ সালে মালয়েশিয়ায় গিয়ে ছিলেন। সেখানে
গিয়ে তিনি প্রতারণার শিকার হয়েছেন। দালাল
যে কাজের কথা বলে নিয়েছেন। তাকে সেই কাজ দেয়া হয়নি। অনেক কষ্ট করে বছর খানেক বিদেশে অবস্থান করেন। পরে
বাড়িতে ফিরে আসেন। চোখে মুখে
অন্ধকার দেখ ছিলেন তিনি। এক
পর্যায়ে প্রতিবেশী খামারী বিল্লালের
পরামর্শ নিয়ে তিনি ৭ হাজার পিস কোলে পাখি ক্রয় করে
তার নিজের বাড়িতে একটি পরিত্যক্ত ঘরে খামার গড়ে তুলেছেন। খামারে বর্তমানে ৩ জন
শ্রমিক ৬ হাজার টাকা বেতনে স্থায়ী ভাবে কাজ করেছেন। তিনি কোয়েল পাখির
খামারের পাশাপাশি মৎস্য খামার গড়ে তুলেছেন। বেকার
যুবকদের প্রতি তার পরামর্শ বিদেশ পারি না
দিয় নিজের বাড়িতেই একটি কোয়েল পাখির খামার করলে
বিদেশের টাকা বাড়িতে বসেই আয় করা সম্ভব।
আরেক খামারি
মিজান জানান, আড়াইহাজারে বিভিন্ন জাতের কোয়েল পাখি পালন করে শত শত বেকার যুবক তাদের ভাগ্য বদল করেছেন। ছোট কোয়েলে পরিণত হয়েছে বড় ধরনের অর্থ
উপার্জনের উৎসে। এলাকায় বাড়ছে
কোয়েল পাখির ব্যবসায়ী ও ক্রেতার সংখ্যা। তিনি আরও বলেন, কোয়েল
পালনের জন্য বেশী পুঁজির দরকার হয় না। বাচ্চা, ডিম বিক্রিতেও কোনো অসুবিধা হয় না। স্থানীয় পাইকার ও ফড়িয়া বাড়ি বাড়ি ঘুরে পাখি ও ডিম সংগ্রহ করে থাকেন। অল্প সময়ের মধ্যেই স্বপ্ন পূরণ হওয়া
সম্ভব। প্রতি মাসেই তার ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা
আয় হচ্ছে। তার খামারটি নিজেই দেখাশুনা করছেন।
আড়াইহাজার
উপজেলা প্রাণি সম্পদ অধিদফতরের কর্মকর্তা ডাক্তার মো: ফারুক আহাম্মদ জানান, আমার জানা মতে আড়াইহাজার উপজেলার
বিভিন্ন এলাকায় ছোট-বড় প্রায় শতাধিক
কোয়েল পাখির খামার রয়েছে। রোগবালাই
কম হওয়ায় অনেকেই কোয়েল বাণিজ্যিক
ভিত্তিতে পালন করে লাভবান হচ্ছেন। তিনি
বলেন, কোয়েল পাখিকে বছরে একবার
কৃমিনাশক খাওয়াতে হয়। প্রিজন
মেলেরিয়া, প্রিজন ফক্স (বসন্ত) রোগের জন্য
তেমন কোনো ঔষধ নেই। তবে নারী
ক্ষেত রোগের জন্য টিকা রয়েছে।
No comments:
Post a Comment