অনেকে শখ করে পায়রা পোষে, অনেকে বিক্রির জন্য। কবুতর পুষে আয়-রোজগারের বিস্তারিত জানাচ্ছেন সানজিদ আসাদ
কবুতর সাধারণভাবে জোড়ায় জোড়ায় বাসা বাঁধে। প্রতি জোড়ায় একটি পুরুষ ও একটি স্ত্রী থাকে। এরা ১২ থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত বাঁচে। যত দিন বাঁচে এরা ডিমের মাধ্যমে বাচ্চা দেয়। ডিম পাড়ার পর স্ত্রী ও পুরুষ উভয় কবুতরই পালা করে তাতে তা দেয়। কবুতরের কোনো জোড়া হঠাৎ ভেঙে গেলে নতুন জোড়া করতে কিছুটা বেগ পেতে হয়। নতুন জোড়া তৈরির জন্য স্ত্রী ও পুরুষ কবুতরকে কিছুদিন একঘরে রাখতে হয়।
বাসস্থান
যাত্রাবাড়ীর কবুতর ব্যবসায়ী শোয়েব আহমদ জানান, পর্যাপ্ত সূর্যের আলো এবং বাতাস চলাচল আছে এ রকম উঁচু জায়গায় কবুতরের খোপ করতে হয়। মাটি থেকে ঘরের উচ্চতা ২০ থেকে ২৪ ফুট এবং খোপের উচ্চতা ৮ থেকে ১০ ফুট হওয়া ভালো। একটি খামারের জন্য ৩০ থেকে ৪০ জোড়া কবুতর আদর্শ।
কবুতরের খোপ দুই বা তিন তলাবিশিষ্ট করা যায়। কাঠ, টিন, বাঁশ, খড় ইত্যাদি দিয়ে সহজে ঘর তৈরি করা যায়। খামারের ভেতরে নরম, শুষ্ক খড়কুটা রেখে দিলে তারা ঠোঁটে করে নিয়ে নিজেরাই বাসা তৈরি করে নেয়। ডিম পাড়ার সময় খোপে খড়, শুকনো ঘাস, কচি ঘাসের ডগাজাতীয় উপাদান দরকার হয়।
খাবারদাবার
গম, মটর, খেসারি, ভুট্টা, সরিষা, যব, চাল, ধান, কলাই ইত্যাদি শস্যদানা কবুতরের খাবার। প্রতিটি কবুতর দৈনিক প্রায় ৩০-৫০ গ্রাম খাবার খায়। প্রজাতিভেদে কবুতরের খাবারও ভিন্ন ভিন্ন। গোল্লা প্রজাতির কবুতর সাধারণত সব ধরনের শস্যদানা খায়। আর গিরিবাজ কবুতর খায় ধান, গম, সরিষা, তিসি, ভুট্টা, কুসুম ফুলের বিচি ইত্যাদি।
ফেন্সি কবুতরের খাবার ডাবলি বুট, ছোলা বুট, গম, সূর্যমুখীর বিচি, কুসুম ফুলের বিচি ইত্যাদি। বাদাম, ডাবলি বুট, ছোলা বুট, ফুলের বিচি, তিসি, বাজরা, চিনা, মুগডাল, মাষকলাই, মসুর, হেলেন ডাল ইত্যাদি হোমারের খাবার।
কবুতরের প্রজনন
কবুতর সাধারণত ছয় মাস বয়সে ডিম দেয়। ডিম ফুটে বাচ্চা বের হতে সময় লাগে ১৭ থেকে ১৮ দিন এবং বাচ্চার এক মাস বয়সেই মা কবুতর আবার ডিম দেয়। ডিম ফুটে বাচ্চা বের হওয়ার পর থেকে বাচ্চাকে খাবার খাওয়ানো থেকে শুরু করে সব ধরনের যত্ন মা-ই করে। ১৫ দিন থেকে এক মাস বয়সী বাচ্চা বাজারে বিক্রি করা যায়।
রেসের কবুতরকে বাচ্চা বয়স থেকেই আলাদাভাবে যত্ন নিতে হয়। কবুতরটির বয়স দুই থেকে তিন মাস হলেই পরিবার থেকে আলাদা করে ভিন্ন খাঁচায় রাখা হয়। চার মাস বয়স হলে আবারও খাঁচা পরিবর্তন করা হয়। এবার খাঁচা থাকে ঘরের বাইরে। ছয় মাস বয়সে বাসস্থানের আশপাশে সর্বোচ্চ ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত ওড়ার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এভাবে রেসার কবুতর উড়তে শেখে। ধীরে ধীরে ওড়ার বেগ ও দূরত্ব বাড়তে থাকে।
বিভিন্ন জাতের কবুতর ও দরদাম
আমাদের দেশে গোল্লা, গিরিবাজ, হোমার এবং ফেন্সি প্রজাতির কবুতর বেশি পালা হয়। গোল্লা প্রজাতির কবুতর বাচ্চা উৎপাদন ও বিক্রির জন্য পালন করা হয়। গিরিবাজ প্রজাতির মধ্যে সবুজ গোল্লা, গরবা, মুসলদম, কালদম, বাগা, চুইনা, লাল চিলা, খয়েরি চিলা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। গিরিবাজ ও হোমার প্রতিযোগিতার জন্য বিখ্যাত। ফেন্সি বা শৌখিন প্রজাতির কবুতরের মধ্যে রয়েছে লক্ষ্যা, প্রিন্স, বল, সুয়া চন্দন, সুইট, কিং সিরাজি, নোটন পায়রা ইত্যাদি।
প্রতি জোড়া দেশি গোল্লা ২০০ থেকে ৬০০, বোম্বাই গোল্লা ৫০০ থেকে এক হাজার, সবুজ গোল্লা এক থেকে এক হাজার ২০০, গরবা ৫০০ থেকে ৭০০, মুসলদম ৮০০ থেকে এক হাজার, কালদম এক থেকে এক হাজার ৬০০, বাগা ৮০০ থেকে এক হাজার, লক্ষ্যা দুই থেকে আড়াই হাজার, প্রিন্স দেড় থেকে তিন হাজার, হোমার প্রজাতির কবুতর পাঁচ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে।
কোথায় পাবেন
প্রতি শুক্রবার গুলিস্তানের কাপ্তানবাজারে কবুতর এবং কবুতরের খাবারের বিশাল হাট বসে। এখানে দেশি-বিদেশি প্রায় সব ধরনের কবুতর পাওয়া যায়। এ ছাড়া জিনজিরায় শুক্রবার, ঢাকার পাগলায় শনিবার হাট বসে। কাপ্তানবাজার এবং কাঁটাবনে কিছু স্থায়ী দোকান আছে, যেখানে সারা সপ্তাহ কবুতর ও খাবার পাওয়া যায়।
রোগবালাই
ঢাকা কেন্দ্রীয় পশু হাসপাতালের প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. শহীদ আতাহার হোসেন জানান, কবুতরের একটি অতিপরিচিত রোগ রানিক্ষেত। এ রোগ প্রতিরোধে কবুতরকে তিন দিন বয়সে, ২১ দিন বয়সে এবং এরপর প্রতি দুই মাস অন্তর প্রতিষেধক টিকা দিতে হয়। বসন্ত রোগের জন্য ডিম পাড়ার আগে মা কবুতরকে এবং বাচ্চাকে ২১ দিন বয়সে টিকা দিতে হয়। কলেরার জন্য জন্মের দুই মাস বয়সে টিকা দিতে হয়। কবুতরের ঠাণ্ডা জ্বর হতে পারে। এ ক্ষেত্রে রেনামাইসিনের সঙ্গে মাল্টিভিটামিন ট্যাবলেট খাওয়ানো হয়। রোগ হলে নিকটস্থ পশু হাসপাতালে যোগাযোগ করতে পারেন। গুলিস্তানের ফুলবাড়িয়ায় ঢাকা কেন্দ্রীয় পশু হাসপাতালেও পাবেন কবুতরের যাবতীয় চিকিৎসাসেবা।
লাভের হিসাব
জোড়া ২০০ টাকা হিসাবে ৩০ জোড়া দেশি কবুতরের দাম পড়বে ৬০০০ টাকা। ঘর বাবদ খরচ হবে ২০০০ টাকা। খাবার ও অন্যান্য খরচ হবে মাসে গড়ে ১০০০ টাকা। প্রতি মাসে গড়ে বাচ্চা পাওয়া যাবে ২৫ জোড়া, দুই মাস পরে প্রতি জোড়া কবুতর ২০০ টাকা দরে বিক্রি করা যাবে। ২৫ জোড়া কবুতর বিক্রি করে পাওয়া যাবে ৫০০০ টাকা। মাসিক খরচ বাদে প্রতি ৩০ জোড়ায় লাভ থাকবে ৪০০০ টাকা। বেশি পালন করলে লাভ বাড়বে। বিদেশি রেসার ও শৌখিন পায়রা পালন করা গেলে লাভের পরিমাণ বাড়বে কয়েক গুণ।
No comments:
Post a Comment