এ বছরের মে মাসের ঘটনা। যুক্তরাষ্ট্রের এক নারী দুই কোটি টাকা দামের
একটি কম্পিউটার ডাস্টবিনে ফেলে দেন। কম্পিউটারটি সিলিকন ভ্যালির একটি
রিসাইকেলিং সেন্টার সংগ্রহ করে দেড় কোটি টাকায় বিক্রি করে। পরে ওই নারী
সিলিকন ভ্যালির কাছে কম্পিউটার বিক্রির টাকা দাবি করেন। সিলিকনের বক্তব্য
ছিল-‘আপনিতো নষ্ট পণ্য ফেলে দিয়েছেন, আমরা সেটা কুড়িয়ে নিয়েছি। যতক্ষণ এটা
আপনার ঘরে ছিল ততক্ষণ আপনার ছিল।’
আমরাও প্রতিদিন এ রকম কমবেশি ছোটখাটো জিনিস ফেলে দিই। ফেলে দেয়া এ জিনিসগুলো রাস্তায় পড়ে থাকে অনাদরে, অবহেলায়। নষ্ট করে পরিবেশের ভারসাম্য। ময়লা ব্যবস্থাপক কিংবা টোকাইরা এগুলো কুড়িয়ে আমাদের পরিবেশকে যেমন সুন্দর রাখেন তেমনি খুলে দেন সম্ভাবনার নতুন দুয়ার। এক জরিপে দেখা যায়, আমাদের ফেলে দেয়া জিনিসপত্রের মধ্যে ২০ ভাগ হচ্ছে প্লাস্টিক। আমাদের ফেলে দেয়া পুরনো এ পণ্যগুলো নতুন রূপে আমাদের কাছে ঘুরেফিরে আসছে। এটাই রিসাইকেলিং পদ্ধতি হিসেবে পরিচিত। রাজধানীর কামরাঙ্গীরচর, লালবাগের লোহার ব্রিজ ও রহমতগঞ্জের ক্লাব ঘাটে গড়ে উঠেছে সে রকম অনেক কারখানা। এর মধ্যে পেট বোতলের কারখানাই বেশি।
২০০৪ সালের কথা। তখন ময়লার মতো ফেলে দেয়া হতো পেট বোতলকে। ২০০৫ সালের দিকে ফেলে দেয়া বোতলগুলো নিতো ভাঙ্গারি দোকানগুলো। তখন বোতলের কেজি ছিল ৪-৫ টাকা। এখন সে বোতল বিক্রি হচ্ছে ৪০-৫০ টাকা কেজি।
কয়েক ধাপ পেরিয়ে একটি পেট বোতল রিসাইকেলিং হয়। শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কুড়ানো এই বোতলগুলো প্রথমে এক জায়গায় স্তূপ করা হয়। তারপর কালার অনুযায়ী আলাদা করা হয়। পরের ধাপে বোতলের মুখ ও কালার আলাদা করা হয়। তারপর মেশিনের মাঝে ঢুকিয়ে চিপসের মতো টুকরো করা হয় বোতলকে। এরপর ধুয়ে-মুছে শুকাতে দেয়া হয়। তারপর হয়ে যায় একধাপ বিক্রি। টুকরো বোতল থেকে দানা করার মতো যাদের মেশিন আছে তারা বিক্রি করেন না। তারা একেবারে দানা করার পর বাজারে ছাড়েন এটা। দানাদার এ প্লাস্টিক বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিক্রি হয়।
রহমতগঞ্জের মাহফুজ প্লাস্টিকের স্বত্বাধিকারী মাহফুজুর রহমানের মতে, সাধরণত আমাদের দেশের চেয়ে চীন এবং কোরিয়াতেই বেশি বিক্রি হয় দানাদার এই প্লাস্টিক। ঢাকায় দানাদার প্লাস্টিকের সবচেয়ে বড় মার্কেট হলো চাঁদনি ঘাটে। প্রায় দুই হাজার দোকানে কেনাবেচা হয় এই দানাদার প্লাস্টিক। মফস্বল ও ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা দানাদার এ প্লাস্টিকগুলো কিনে নেয় বড় কোম্পানিগুলো। তারা এটা দিয়ে নতুন করে পণ্য তৈরি করে। যেসব পণ্য তৈরি হয় সেগুলো হলো খেলনার জিনিসপত্র, বালতি, ঝুড়ি, চিরুনি, কলমদানী, প্লেট, জগ, গ্লাস ও চায়ের কাপ প্রভূতি। এ দোকানগুলোর দৈনিক বিক্রি ৫০ হাজার থেকে ৫ লাখ টাকা।
পেট বোতলের পাশাপাশি নিষিদ্ধ পলিথিন, বিদ্যুতের তার, বালতি, ড্রামসহ প্লাস্টিকের অন্যান্য পণ্যও রিসাইকেলিং হয়। বুড়িগঙ্গার তীরে ক্লাবঘাট এলাকায় গড়ে উঠেছে অসংখ্য কারখানা। সারাদিনই বস্তায় বস্তায় প্লাস্টিক আসছে আর যাচ্ছে।
ক্লাবঘাটের রিয়াজ প্লাস্টিকে গিয়ে দেখা যায় সেখানে নিষিদ্ধ পলিথিন থেকে রিসাইকেলিং হচ্ছে দানাদার প্লাস্টিক। পলিথিন রিসাইকেলিংয়ে কয়েকটি ধাপ অবলম্বন করা হয়। পেট বোতলের প্রক্রিয়া থেকে এটি সামান্য আলাদা। প্রথমে পলিথিনকে কাটার মেশিনে ফেলে ধানের কুড়োর মতো গুঁড়ো করা হয়। তারপর হিটারের মাধ্যমে এগুলোকে গরম করে পৌঁছানো হয় দানার মেশিনে। হিটার থেকে দানার মেশিনে পাঠানোর আগে পানির হাউসে রেখে ঠান্ডা করা হয়। তারপর গুঁড়োর মেশিন থেকে বেরিয়ে আসে দানাদার প্লাস্টিক। সবগুলো পণ্যেরই এ রকম আলাদা আলাদা প্রক্রিয়া রয়েছে।
প্লাস্টিকের এই পুনর্বাসনকে ঘিরে জীবিকার চাকা ঘুরছে অনেকের। প্লাস্টিকের সংগ্রাহক, ভাঙ্গারি ব্যবসায়ী, কারখানার মালিক, শ্রমিকসহ অনেকের কর্মসংস্থান হচ্ছে।
কামরাঙ্গীচরের আর্ট প্লাস্টিকের মালিক মফিজ উদ্দিন বলেন, ‘আমার কারখানায় ৩৫ জন শ্রমিক নিয়মিত কাজ করছেন। এদের বেতন ৬ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা। এছাড়া ভাঙ্গারি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে তো লেনদেন চলছেই।’
ক্লাবঘাটের ন্যাশনাল প্লাস্টিকের স্বত্বাধিকারি হাজি আবদুস সাত্তার বলেন, ‘আমার এখানে ২৪ জন লোক কাজ করেন। এদের বেতন ৭ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা। মেশিনম্যানরা আরো বেশি বেতন পান।’
পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য প্লাস্টিক রিসাইকেলিংয়ে সরকারও সহোযোগিতা করছে।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব বাসুদেব আচার্য্য বলেন- রিসাইকেলিংয়ের প্রতি সরকারের সুনজর রয়েছে। সরকার এ খাতে প্রতি বছর ১০ শতাংশ ইনসেনটিভ দিয়ে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে আলাদা প্লাস্টিক শিল্পনগরী গড়ে তোলার চিন্তা করছে সরকার। তবে প্লাস্টিক অ্যাসোসিয়েশনগুলোর মতে সরকার এ বিষয়ে যতটুকু সহযোগিতা করা দরকার ততটুকু করছে না।
বাংলাদেশ প্লাস্টিক গুডস ম্যানুফেকচারার্স অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েশনের চকবাজার অফিসের ইনচার্জ ঝনি বলেন, প্লাস্টিক শিল্পের একটি বিশাল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সরকারের সহযোগিতা অপ্রতুল। প্লাস্টিক ভাঙানোর পরে তা পরিষ্কার করার মতো কোনো ওয়াশিং প্লান্ট নেই আমাদের দেশে। ভাঙ্গারি কারখানার মালিকরা নিজ উদ্যোগে বিভিন্ন মাধ্যমে ওয়াশিং প্লান্টের কাজ সেরে নিচ্ছেন। কিন্তু এগুলো শিল্প মন্ত্রণালয়ের অনুমোদিত পদ্ধতি নয়। তাছাড়া এ পদ্ধতিগুলোতে তাদের খরচও বেশি পড়ে।
বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব প্লাস্টিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজির নির্বাহী কর্মকর্তা জীবন কুমার চৌধুরী বলেন, প্লাস্টিক রিসাইকেলিং সেক্টরের বিকাশ ঘটলেও কারিগরি ও প্রযুক্তি সহায়তা তেমন পাচ্ছে না এই সেক্টর। দেখা যাচ্ছে ছোট্ট একটি টেস্টিংয়ের জন্যও আমাদের বিদেশ দৌড়াতে হচ্ছে।
প্লাস্টিক শিল্পের সঙ্গে জড়িতদের দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবি প্লাস্টিক শিল্পনগরী স্থাপনের কাজ এখনো সম্পন্ন হয়নি। নগরী স্থাপনের জন্য বিসিক ও বিপিজিএমইএ একযোগে কাজ করে যাচ্ছে। ঢাকার নিকটবর্তী সিরাজদিখান উপজেলার দ্বিতীয় ধলেশ্বরী ব্রিজের পশ্চিম পাশে বড়বর্ত্তা এলাকায় ৫০ একর জমির ওপর একটি আধুনিক পরিকল্পিত প্লাস্টিক শিল্পনগরী গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন তারা।
বিপিজিএমই-এর সাধারণ সম্পাদক কে এম ইকবাল হোসেন জানান, প্রকল্পটি সরকারের বিবেচনায় রয়েছে। আমরা আশা করছি অচিরেই প্রকল্প বাস্তবায়নের ব্যাপারটি চূড়ান্ত হবে। প্লাস্টিক শিল্পনগরী বাস্তবায়ন হলে শুধু রিসাইকেলিংই নয়, গোটা প্লাস্টিক শিল্প বিকাশের পথই সুগম হবে।
No comments:
Post a Comment